Listen

Description

দুর্গা পুজো এত আগে না যত আগে শ্রীভুমি শুরু করে , দুর্গা পুজো এত পরেও না যত পরের ডেলিভারি ডেট অনলাইন শপিং সাইটগুলো দেয় । 

এটা ফেসবুকে লিখেছিলাম এবং প্রচুর হা হা রিয়্যাক্ট ও পড়েছে এই পোস্টে। এটা জাস্ট মজা করে বলা হলেও, ঘটনা হল, যে দুর্গাপুজো বাংলার প্রাচীনতম, সেটার শুরু কিন্তু দূর্গা পুজোর প্রায় দু সপ্তা আগে থেকেই হয়, এবং মোটামুটি উনিশ দিন ধরে চলে । প্রথম দুর্গা পুজো বললাম কারন আমাদের বাঙালিরা  দুর্গাপুজো বলতে যেটা বুঝি সেই ফরম্যাটের পুজো। এখানে দেবী সপরিবারে আছেন, একদিকে গনেশ আর লক্ষী, অন্য দিকে সরস্বতী এবং কার্তিক। মাথার উপর বা মাথার পিছনে শিব ঠাকুর। অন্যদিকে দুর্গাপুজোর অন্যরূপ, যেটা উত্তর ভারত বা পশ্চিম ভারতে বহুল প্রচলিত সেই নভরাত্রিতে দূর্গা একাই থাকেন , পরিবার ছাড়া। সেই ফরম্যাট আজকের আলোচনার মধ্যে পড়ছে না। 

নমস্কার আমি সৃজন , আজ সৃজনের পডাবলীতে কথা হবে বিষ্ণুপুরের, দেবী মৃন্ময়ীকে নিয়ে। বাংলার প্রথম দূর্গাপুজো , শুরু হয়েছিল হাজার বছরের ও বেশি আগে এবং সেই ট্রাডিশন আজও চলছে।   

বাংলার প্রথম দুর্গাপুজো, এই যে কথাটা বললাম, এই কথাটায় বিতর্ক হতে পারে। কারন এখনকার বাংলার ভৌগলিক সীমারেখার সাথে হাজার বছর আগেকার ভৌগলিক সীমারেখা এক ছিল না।  সেই সময় ওই অঞ্চলের বা রাজ্যের নাম ছিল মল্লভূম , যার বিস্তৃতি ছিল এখনকার বাঁকুড়া , বীরভূম , বর্ধমান , মেদিনীপুরের কিছুটা , মুর্শিদাবাদের কিছুটা , পুরুলিয়ার কিছুটা হয়ে এখনকার ঝাড়খণ্ডের খানিকটা জায়গা যেটা ছোটনাগপুর মালভূমির গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ। এই মল্লভূমের রাজধানী ছিল আজকের বিষ্ণুপুর। বিষ্ণুপুর নামটা অনেক নতুন , রাজারা শাক্ত থেকে বৈষ্ণব হওয়ার পরের ঘটনা। 

মল্লযুদ্ধ কথাটা কমবেশি আমরা জানি, এখন যেটাকে কুস্তি বা রেসলিং বলা হয়। শোনা যায় মল্লভূমের প্রথম রাজা রঘুবীর কুস্তিতে খুবই  পারদর্শী ছিলেন , সেই থেকে ওনার নাম হয় আদি মল্ল এবং রাজ্যের নাম মল্লভুম । ওনার নাম ওনার সময়ে আদি মল্ল ছিল কিনা আমার personally একটু doubt আছে। নতুন কোন মল্ল না এলে আগের লোককে আদি বলার প্রয়োজন পরে কি ?  মনে হয় না। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য জানতেন তিনি দ্বিতীয় , প্রথম চন্দ্রগুপ্ত কি জানতেন যে পরে আর একপিস আসবে ! 

যাইহোক , বইপত্তর বা ইন্টারনেটে সবাই আদি মল্ল বলছে, আমি কোন রকম জ্যাঠামি না করে সেটাতেই stick করি। এই আদি মল্লর রাজধানী ছিল জয়পুরের জঙ্গলের কাছে কোথাও , জায়গার নাম কি ছিল বলুন তো ? নাহ বনলতা ছিল না, ছিল প্রদ্যুম্নপুর। 

এবার একটা গল্প বলব, যেটার আমি অনেকগুলো ভার্সান পেয়েছি ইন্টারনেটে। হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ঘোরার ফলে অনেকগুলো ভার্সন হওয়া আশ্চর্যের কিছু না। আমি যে ভার্সানটা  বলছি, সেটা আমি যখন গত বছর নভেম্বরে, সপরিবারে বিষ্ণুপুর ঘুরতে গেছিলাম, তখন স্থানীয় গাইডের কাছে শুনেছিলাম। 997 সালের ঘটনা , যদিও মল্লরাজ্যে তখন মল্লাব্দ দিয়ে সাল গননা হয়, তবে সেই মল্লাব্দর হিসেবে ডেট দিয়ে আপনার মাথা খারাপ করছি না। 

আদি মল্লর বংশধর , মল্লরাজ জগৎমল্ল বেড়িয়েছেন শিকারে । জয়পুরের জঙ্গল এখনো বেশ ঘন জঙ্গল , তখন আরো বেশি ছিল। সেটাই স্বাভাবিক, কারন ব্রিটিশ আমলে এখনকার গড়িয়ায় বাঘ আর সল্টলেকে কুমির ঘুরে বেড়াতো , এতো হাজার বছর আগের কথা। 

যাই হোক, গল্পে আসি , জগৎমল্ল এক জায়গায় এক হরিণকে দেখে তাড়া করেন এবং অব্যার্থ নিশানায় তার দিকে তীর ছোড়েন। তীর হরিণকে ছোয়ার মুহূর্তে, সে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, রাজা তো অবাক । রাজা এবার লক্ষ করেন সেখানে এক বটগাছের ডালে একটি বক বসে আছে , তিনি তার শিকারী বাজপাখিকে পাঠান সেই বককে মারতে। এবারও অদ্ভুত ঘটনা , বক মেরে ভাগিয়ে দেয় রাজার সাধের বাজকে। 

রাজা যখন ভাবতে থাকেন কি ঘটছে , সেই সময় মা দূর্গা রাজার সামনে আবির্ভূত হয়ে জানান , এসবই তার সৃষ্টি করা মায়া। সেই বটগাছের নিচে খুঁজলে পাওয়া যাবে দেবীর মুখমন্ডল। তাতে মূর্তি গড়ে সেইখানেই প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শুধু তাই নয় , রাজধানীও সরিয়ে আনতে হবে সেখানে।  জগৎমল্ল সেটাই করেন। সেই বটগাছের নিচে সত্যি সত্যিই খুঁজে পাওয়া যায় দেবীর মুখের আদল। গঙ্গামাটি দিয়ে বাকি মূর্তি গড়া হয়।  সেই মূর্তি, সেই মন্দির এখনো স্বমহিমায় বিরাজমান। তবে পাশের রাজপ্রাসাদ ভেঙে পড়েছে সময়ের সাথে সাথে, মেইনটেন্যান্স এর অভাবে। 

বিষ্ণুপুরে গিয়ে যে কাউকে জিজ্ঞেস করবেন - মৃন্ময়ী মন্দির, আপনাকে নিয়ে চলে যাবে। নিজে গাড়ি করে গেলে তো গুগল ম্যাপ আছেই। মা মৃন্ময়ীর যে ছবি পডকাস্টের কভারে দেওয়া আছে , সেটা উইকিপিডিয়া থেকে নেওয়া। রাজপরিবারের অনুমতি ছাড়া দেবীর ছবি তোলা নিয়মবিরুদ্ধ। তাই ছবি তোলার ইচ্ছে থাকলে  অনুমতি নিয়ে যেতে হবে। আর এখানে লক্ষ্য করার মতন বিষয় হল, লক্ষীর উপরে গনেশ এবং সরস্বতীর উপরে কার্তিক থাকে। অন্য সব দুর্গাপুজোয় যেটা উল্টো।